পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মহিলা উপভোক্তা এখন একটাই প্রশ্ন খুঁজছেন, অন্নপূর্ণা যোজনার ভেরিফিকেশন কীভাবে করতে হয় এবং কোন ওয়েবসাইটে গিয়ে করতে হবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে অন্নপূর্ণা যোজনায় রূপান্তরের পর রাজ্য সরকার একটি বড় মাপের যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চালু করেছে, এবং এই ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ না হলে মাসিক তিন হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। এই প্রতিবেদনে আমরা সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিতভাবে জানাচ্ছি যে অফিসিয়াল পোর্টাল কোনটি, ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়া কী, এবং কোন কোন ভুয়ো ওয়েবসাইট থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্নপূর্ণা যোজনার সরকারি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট আসলে কোনটি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য নির্ধারিত একমাত্র সরকারি পোর্টাল হলো socialregistry.wb.gov.in। এই ওয়েবসাইটটি ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার অর্থাৎ NIC দ্বারা তৈরি এবং সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মালিকানাধীন ও পরিচালিত। ডোমেইন নেমের শেষে .wb.gov.in থাকাটাই এই পোর্টালের সরকারি পরিচয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ, কারণ ভারতের কোনো রাজ্য সরকারের প্রকৃত পোর্টাল কখনোই .com, .org বা সাধারণ .in ডোমেইনে পরিচালিত হয় না। পোর্টালের ফুটারে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে যে এই সাইটের কনটেন্ট, ডেটা এবং পরিচালনার সম্পূর্ণ স্বত্ব পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে। আগে যে কাজ socialsecurity.wb.gov.in পোর্টাল থেকে হতো, তা এখন নতুন socialregistry.wb.gov.in পোর্টালে স্থানান্তরিত হয়েছে, এবং পুরোনো পোর্টালে গেলে এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন পোর্টালে রিডাইরেক্ট হয়ে যায়।
কেন অন্নপূর্ণা যোজনার ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প থেকে অন্নপূর্ণা যোজনায় উপভোক্তাদের স্থানান্তরের আগে রাজ্য সরকার একটি বিস্তারিত ডেটাবেস স্ক্রুটিনি এবং উপভোক্তা যাচাইকরণ অভিযান পরিচালনা করেছে। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল উপভোক্তাদের তথ্য আপডেট করা এবং অযোগ্য নামগুলি ডেটাবেস থেকে বাদ দেওয়া। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়ায় প্রায় ত্রিশ লক্ষ নাম অযোগ্য অথবা অনুপস্থিত ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে স্থানান্তরের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যেসব মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তা ছিলেন কিন্তু তিন জুনের পর তিন হাজার টাকার প্রথম কিস্তি পাননি, তাঁদের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা থাকছে যে যাচাইকরণের সময় তাঁদের নাম বাদ পড়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আবার নতুন করে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে অনলাইন বা অফলাইন মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
কীভাবে ধাপে ধাপে অন্নপূর্ণা যোজনার পোর্টালে লগইন করে ভেরিফিকেশন করবেন
ভেরিফিকেশনের প্রক্রিয়াটি মূলত মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার দুই মাধ্যমেই সহজে সম্পন্ন করা যায়। প্রথমে socialregistry.wb.gov.in/citizen/ এই লিংকে গিয়ে অফিসিয়াল সিটিজেন পোর্টালটি খুলতে হবে। পোর্টাল খোলার পর হোমপেজে থাকা অপশন থেকে নিজের জেলা নির্বাচন করতে হবে, কারণ জেলা নির্বাচন না করলে পরের ধাপে যাওয়া সম্ভব হয় না। জেলা বেছে নেওয়ার পর যে মোবাইল নম্বরটি আবেদনপত্র অথবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত আছে, সেই দশ সংখ্যার নম্বরটি লিখতে হবে। মোবাইল নম্বর দেওয়ার পর Request OTP বাটনে ক্লিক করলে রেজিস্টার্ড নম্বরে একটি ছয় সংখ্যার ওটিপি পাঠানো হয়। সেই ওটিপি সঠিকভাবে বসিয়ে সিকিউরিটি ক্যাপচা পূরণ করার পরেই সিস্টেমে প্রবেশ করা সম্ভব হবে। লগইন সফল হলে স্ক্রিনে উপভোক্তার প্রোফাইল এবং পরিবারের তথ্য সংগ্রহের ফর্ম দেখানো হবে, যেখানে পরিবারের সকল সদস্যের নাম, জন্মতারিখ, আধার নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ এবং বিদ্যমান সরকারি সুবিধার তথ্য পূরণ করতে হয়।
ভেরিফিকেশনের জন্য কোন কোন ডকুমেন্ট হাতের কাছে রাখা জরুরি
ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে চাইলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। আধার নম্বরের সাথে যুক্ত মোবাইল নম্বরটি অবশ্যই সক্রিয় থাকা দরকার, কারণ ওটিপি যাচাইকরণ এর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ব্যাংক পাসবুক বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতের কাছে রাখলে অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং IFSC কোড লেখার সময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। রেশন কার্ড, যেটি BPL, AAY অথবা PHH শ্রেণির অধীনে থাকা প্রয়োজন, তার তথ্যও ফর্মে উল্লেখ করতে হয়। যাঁদের জমির রেকর্ড বা RoR সংক্রান্ত কাগজপত্র অথবা জাতিগত শংসাপত্র রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ডকুমেন্টগুলিও প্রয়োজন হতে পারে, কারণ এগারো পাতার সম্পূর্ণ ফর্মে এই সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য যোগ্যতার শর্তগুলি কী কী
যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করার আগে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো, কারণ শর্ত পূরণ না হলে ফর্ম বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবেদনকারী মহিলার বয়স আবেদনের তারিখে পঁচিশ থেকে ষাট বছরের মধ্যে থাকা আবশ্যক। পরিবারের কাছে BPL, AAY অথবা PHH শ্রেণির বৈধ রেশন কার্ড থাকতে হবে, শুধুমাত্র APL কার্ড থাকা পরিবার অথবা যাদের কোনো রেশন কার্ড নেই তারা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না। আবেদনকারীর নিজের নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা দরকার, যেটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট হলে চলবে না, এবং সেই অ্যাকাউন্টে আধার লিংক ও DBT সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। যদি আবেদনকারী অথবা তাঁর পরিবারের কেউ ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেন, তাহলে তিনি এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না, কারণ এই প্রকল্প মূলত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলির জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ভুয়ো ওয়েবসাইট এবং ফিশিং স্ক্যাম থেকে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে ইন্টারনেটে এমন কিছু সাইট ছড়িয়ে পড়েছে যেগুলি দেখতে সরকারি পোর্টালের মতো লাগলেও সেগুলি প্রকৃতপক্ষে সরকারি নয়। রাজ্য সরকার নিজে থেকেই নাগরিকদের সতর্ক করেছে যে এই ধরনের অনির্দিষ্ট “অ্যাপ্লাই নাও” লেখা ওয়েবসাইট এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলি ফিশিং স্ক্যামের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করার চেষ্টা করতে পারে। কোনো ওয়েবসাইটে গিয়ে যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের শেষ চার সংখ্যা, আধার নম্বর বা ওটিপি চাওয়া হয় এবং সেই ওয়েবসাইটের ডোমেইন .wb.gov.in না হয়, তাহলে সেখানে কোনো তথ্য না দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। আসল সরকারি পোর্টালে গিয়ে ঠিকানার বারে স্পষ্টভাবে socialregistry.wb.gov.in লেখা আছে কিনা, এবং পেজের নিচে Legal Disclaimer, Privacy Policy এবং Terms and Conditions এর মতো অফিসিয়াল পলিসি পেজগুলি সক্রিয় আছে কিনা, তা ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
ভেরিফিকেশনের পর পেমেন্ট স্টেটাস কীভাবে চেক করবেন
ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর তিন হাজার টাকার কিস্তি অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য কয়েকটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ব্যাংক পাসবুক আপডেট করে দেখা, অথবা মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা এসএমএস ব্যাংকিং পরিষেবার মাধ্যমে সাম্প্রতিক ট্রানজাকশন পরীক্ষা করা। অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনা অথবা WB DBT এই শব্দগুলি উল্লেখ করে কোনো ক্রেডিট এন্ট্রি দেখা গেলে তা বুঝতে হবে যে কিস্তি সফলভাবে জমা হয়েছে। যদি আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন টাকা না আসে, তাহলে নিকটস্থ BDO অফিস অথবা SDO অফিসে গিয়ে সরাসরি যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান চাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে পোর্টালে কোনো পৃথক অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন ট্র্যাকিং সুবিধা না থাকায়, স্টেটাস সংক্রান্ত যেকোনো জিজ্ঞাসার জন্য সরাসরি ব্লক বা সাব ডিভিশন অফিসে যোগাযোগ করাটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার উপভোক্তাদের জন্য বিশেষ কী পরিবর্তন এসেছে
যাঁরা আগে থেকেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সক্রিয় ও যাচাইকৃত উপভোক্তা ছিলেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই, কারণ রাজ্য সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের অন্নপূর্ণা যোজনার নতুন কাঠামোয় স্থানান্তরিত করেছে। তিন জুন তারিখে আঠাশ লক্ষেরও বেশি উপভোক্তা মহিলা প্রথম কিস্তির তিন হাজার টাকা সরাসরি তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেয়েছেন। তবে যাঁরা মৃত, স্থান পরিবর্তন করেছেন, ডিলিট হয়ে গিয়েছেন অথবা অনুপস্থিত ভোটার হিসেবে যাচাইকরণে চিহ্নিত হয়েছেন, তাঁদের নাম স্বাভাবিকভাবেই এই স্থানান্তরের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছে। নতুন আবেদন মূলত তাঁদের জন্যই নির্ধারিত যাঁরা আগে কোনো কারণে আবেদন করতে পারেননি অথবা যাচাইকরণে বাদ পড়ে গিয়েছেন এবং এখনও যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেন।
অফলাইনে ভেরিফিকেশন বা আবেদন করার বিকল্প পদ্ধতি
যাঁদের কাছে ইন্টারনেট সংযোগ বা স্মার্টফোনের সুবিধা সীমিত, তাঁদের জন্য অফলাইন মাধ্যমে আবেদন এবং ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থাও চালু রাখা হয়েছে। নিকটস্থ ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিস, মিউনিসিপ্যালিটি অফিস অথবা নির্দিষ্ট সরকারি ক্যাম্পে গিয়ে ফর্ম সংগ্রহ করে সেলফ অ্যাটেস্টেড ডকুমেন্ট সহ জমা দেওয়া যায়। জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ সংগ্রহ করে রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ পরবর্তী সময়ে যাচাইকরণের অগ্রগতি জানার জন্য এই রসিদ প্রয়োজন হতে পারে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে জনকল্যাণ শিবিরের মতো ক্যাম্প আয়োজন করে সরকারি কর্মীরা সরাসরি গিয়ে মানুষকে ফর্ম পূরণ এবং ব্যাংক সিডিং সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করছেন, যা গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হয়ে উঠেছে।
পরিশেষে যা মনে রাখা প্রয়োজন
অন্নপূর্ণা যোজনার ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং একমাত্র socialregistry.wb.gov.in এই সরকারি পোর্টালের মাধ্যমেই করা সম্ভব। কোনো এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারীকে টাকা দিয়ে এই কাজ করানোর কোনো প্রয়োজন নেই, এবং সরকারি পোর্টাল ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত বা ব্যাংকিং তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রক্রিয়াটি শুরু করার আগে নিজের যোগ্যতা যাচাই করে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট হাতের কাছে প্রস্তুত রাখা সময় বাঁচাতে সাহায্য করবে। যেকোনো সমস্যায় নিকটস্থ BDO বা SDO অফিসে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য সমাধান।


